বরগুনায় দীর্ঘদিন ধরে একটি সড়কের সংস্কার কাজ না করে ফেলে রাখায় দ্রুত সংস্কারের দাবিতে বাঁশ দিয়ে আটকে সড়ক অবরোধ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ সময় তারা ওই সড়কেই অবস্থান নেন। এতে সড়কটির দুই পাশে আটকে পড়ে ছোট-বড় বিভিন্ন যানবাহন ও যাত্রীরা। পরে সড়কটির দ্রুত সংস্কারের আশ্বাস দিতে ঘটনাস্থলে এসে স্থানীয়দের তোপের মুখে পড়েন এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শ্যামল কুমার গাইন ও সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত বরগুনা সদর উপজেলার ৮ নম্বর ঢলুয়া ইউনিয়নের বরগুনা-নিশানবাড়ীয়া সড়কের ক্রোক নামক এলাকায় এ অবরোধ করেন স্থানীয়রা। পরে এলজিইডি কর্তৃপক্ষের দেওয়া ১ মাসের মধ্যে সড়ক সংস্কার সম্পন্নের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাড়ে ২২ কিলোমিটার ওই সড়কের মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়কের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে এখনও ১২ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে সংস্কারাধীন। এর মধ্যে আবার দীর্ঘদিন ধরে একেবারেই কাজ বন্ধ রয়েছে ৬-৭ কিলোমিটার সড়কের। ফলে প্রতিদিন শতশত ছোট-বড় বিভিন্ন যানবাহন চলাচলে সড়ক থেকে সৃষ্ট ধুলাবালিতে বিভিন্ন রোগে আক্রান্তসহ নানা ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আর এ কারণেই দ্রুত সড়কটিকে সংস্কারের দাবিতে বাঁশ দিয়ে আটকে সড়ক অবরোধ করেন ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দারা।
বরগুনার এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বরগুনা সদর উপজেলার বরগুনা-নিশানবাড়িয়া সড়কের সাড়ে ২২ কিলোমিটার সংস্কার কাজে মোট ৩৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে ৯টি প্যাকেজে ভাগ করা হয়। পরে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ১ বছর মেয়াদে ৮টি প্যাকেজের কাজ শুরু করেন বরেন্দ্র কনস্ট্রাকশন এবং ১টি প্যাকেজের কাজ শুরু করেন জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স নামে দুইটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে বরেন্দ্র কনস্ট্রাকশন রাজশাহীর একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তাদের প্রতিনিধি হয়ে ওই ৮টি প্যাকেজের ৪টির কাজ শুরু করেন বশির নামে এক স্থানীয় ঠিকাদার। কাজ শুরুর পর দুইটি প্যাকেজ সম্পন্ন করে একটি মামলায় বশির গ্রেপ্তার হলে বাকি দুইটি প্যাকেজের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়াও সড়কের নির্ধারিত প্রায় সাড়ে ২২ কিলোমিটারের মধ্যে এখন পর্যন্ত মোট ১০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ১২ কিলোমিটার কাজের ধীর গতিতে দুর্ভোগে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা।
সড়ক অবরোধে অংশ নিয়ে বশির উদ্দিন নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, প্রায় তিন বছর ধরে এই সড়কটি সংস্কারাধীন অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু কাজ শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ ছয় মাস বা তার একটু বেশি সময়ের মধ্যে এ কাজ সম্পন্ন করতে পারলেও তা তিন বছরেও সম্পন্ন হয়নি। সড়কটির প্রসস্থ ১৮ ফুট হওয়ায় সকল গাড়িরই গতি বেশি থাকে। ফলে যখন কোনো গাড়ি সড়ক দিয়ে যায়, তখন মনে হয় ধুলার মেঘ উড়ে যাচ্ছে। আশপাশের প্রত্যেক বাসিন্দার বাড়িতে এই ধুলার স্তুপ তৈরি হয়েছে। এছাড়াও শিশু বৃদ্ধরা সবাই এখন শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন।
বরগুনা-নিশানবাড়িয়া সড়কে নিয়মিত যাতায়াত করা আমতলী এলাকার বাসিন্দা মো. খলিলুর রহমান বলেন, এভাবে সড়কের কাজ ফেলে রাখা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। প্রায় এক বছর ধরে এই সড়কের পাশে থাকা প্রত্যেকই সর্দি, কাশি এবং শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়েছেন। আশপাশের সবজি ক্ষেত পুকুর বাড়িঘর সব ধুলায় নষ্ট হয়ে গেছে।
অবরোধে আটকে পড়া সুলতান নামে এক অটোরিকশা চালক বলেন, আমি সড়ক অবরোধের পক্ষে। প্রায় দশ বছর ধরে এই সড়কে গাড়ি চালাই। কিন্তু কখনোই দেখিনি পুরো সড়কটি ভালোভাবে মেরামত করা হয়েছে। সড়কের বিভিন্ন জায়গায় ভাঙাচোরা খানাখন্দ থেকেই যায়।
বরগুনা সদর ইউনিয়ের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ক্রোক এলাকার ইউপি সদস্য মো. মোশারেফ হোসেন বলেন, রাস্তা অবরোধের মূল কারণ এখানকার বাসিন্দারা ধুলাবালির কষ্টে এখন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। যখন একটি গাড়ি যায় তখন তার পাশ দিয়ে হাঁটা তো দূরের কাথা কেউ দাঁড়াতেও পারে না। আশপাশের যত বাড়িঘর আছে তা ধুলাবালিতে লাল হয়ে আছে। ঘরের মধ্যে খাবার খেলেও এই ধুলাবালি মিশ্রিত খাবার খেতে হয়। এছাড়াও বর্তমানে এই সড়কের পাশের বাসিন্দাদের অনেকেই শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্করা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। আমরা চাই দ্রুত এ সড়কের সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা হোক।
ঘটনাস্থলে এসে স্থানীয় বাসিন্দাদের তোপের মুখে দ্রুত সড়ক সংস্কারের আশ্বাস দিয়ে বরগুনা এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শ্যামল কুমার গাইন বলেন, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বরেন্দ্র কনস্ট্রাকশনের ম্যানেজার মো. বশির উদ্দিন গ্রেপ্তার থাকলেও তাদের অন্য ম্যানেজার কাজ করবে। প্রতিনিধি গ্রেপ্তারের সঙ্গে কাজ বন্ধ থাকার কোনো সুযোগ নাই। মূল ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা আগামী শুক্রবার থেকেই কাজ শুরু করবে। আমাদের তৎপরতা বজায় রেখেছি। তবে যখন বর্ষাকালে কাজ শুরু হয় তখন মালামালের গুণগত মান ভালো না থাকায় কাজ বন্ধ রেখেছিলাম, যাতে শুকনার সময় ভালো ইট পাওয়া যায়। আর সড়কে ধুলা বন্ধে ঠিকাদারকে পানি দিতে দেখেছি, তবে অল্প সময়েই পানি শুকিয়ে যায়। আমরা কাজ শুরুর আগ পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করবো, যাতে স্থানীয় বাসিন্দাদের কোনো অসুবিধা না হয়। আশা করি আগামী এক মাসের মধ্যেই এই সড়কের সংস্কার কাজ শেষ করা যাবে।
এ বিষয়ে বরগুনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান খান বলেন, সড়কটির বর্তমানে কার্পেটিং করার কাজ বাকি আছে। তবে এ সময়ে ঠিকাদর গ্রেপ্তার হওয়ায় কাজটি বন্ধ আছে। আর এ কারণেই জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি হওয়ায় তারা রাস্তায় নেমেছেন। আমরা সংশ্লিষ্ট মূল ঠিকাদারের সঙ্গে কাথা বলেছি তারা আগামী শুক্রবার থেকে কাজ শুরু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আশাকরি কাজ শুরুর এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই সড়ক সংস্কার সম্পন্ন হবে।











