যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লেবাননের রাজধানী বৈরুতের ঘনবসতিপূর্ণ বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় আকস্মিক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাবে, এসব হামলায় ডজনখানেক মানুষ নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন। বুধবার (৮ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েট প্রেস (এপি)
ইসরায়েল আগেই জানায়, এই যুদ্ধবিরতি লেবাননে তাদের চলমান যুদ্ধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান দাবি করেছে, লেবাননও এর অন্তর্ভুক্ত।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এটিকে চলমান যুদ্ধে সবচেয়ে বড় সমন্বিত হামলা বলে উল্লেখ করেছে। তাদের দাবি, মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে ১০০টির বেশি হিজবুল্লাহ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে, যা বৈরুত, দক্ষিণ লেবানন এবং পূর্বাঞ্চলের বেকা উপত্যকাজুড়ে চালানো হয়।
হামলার পর সমুদ্রতীরবর্তী রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। ব্যস্ত বিকেলে হঠাৎ বিস্ফোরণে থমকে যায় যানবাহনের শব্দ। অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়, আগুনে পুড়ে যাওয়া গাড়ি ও বিধ্বস্ত ভবনের মধ্যে উদ্ধারকাজ শুরু হয়। অনেক হামলা হয়েছে জনবহুল বাণিজ্যিক এলাকায়, ফলে রাস্তায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানায়, বৈরুতের অন্তত পাঁচটি এলাকায় এসব বিমান হামলা হয়েছে।
গত ২ মার্চ শুরু হওয়া ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাতের পর থেকে বৈরুতে এমন হামলা তুলনামূলক কম দেখা গেলেও দক্ষিণ ও পূর্ব লেবানন এবং বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে নিয়মিত হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল।
হামলার আগে হিজবুল্লাহর এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এপিকে জানান, মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টাকে সময় দিতে তারা অপেক্ষা করছে। তবে তিনি বলেন, ইসরায়েল যখন যুদ্ধবিরতি মানছে না, তখন আমরাও এতে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মতি দিইনি। তিনি আরও বলেন, ২ মার্চের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া তারা মেনে নেবে না, যেখানে যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই হামলা চালাত।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পরপরই হিজবুল্লাহ সীমান্তে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যার জেরে আঞ্চলিক যুদ্ধের সূচনা হয়। এর জবাবে ইসরায়েল লেবাননে ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও স্থল অভিযান শুরু করে। ইসরায়েলি সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়েল জামির বলেন, উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার জন্য হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তারা ‘সব ধরনের সামরিক সুযোগ’ কাজে লাগিয়ে হামলা চালিয়ে যাবে।
এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে ১ হাজার ৫৩০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শতাধিক নারী ও শিশু রয়েছে। এ ছাড়া ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
বুধবার ভোরে যুদ্ধবিরতির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বৈরুত ও সাইদার রাস্তায় অস্থায়ীভাবে বসবাসরত অনেক বাস্তুচ্যুত মানুষ ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু বলে, লেবাননে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলে তাদের পরিকল্পনা থমকে যায়।
বৈরুতের সমুদ্রতীরবর্তী একটি শরণার্থী শিবিরে থাকা মানুষজন এ পরিস্থিতিতে বিভ্রান্তি ও হতাশা প্রকাশ করেন। ৩৫ বছর বয়সী ফাদি জায়দান বলেন, টেন্টে থাকা, গোসল করতে না পারা, আমরা আর নিতে পারছি না।
তিনি ও তার পরিবার দক্ষিণের নিজ শহর নাবাতিয়েতে ফিরতে প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু নতুন ঘোষণার পর তারা আপাতত সাইদাতেই অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, এখন বাড়ি ফিরলে আমরা লক্ষ্যবস্তু হয়ে যাব।












