আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের প্রত্যাবর্তনের পরও পাকিস্তান ও সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়নি। বরং তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে টিটিপি পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। যদিও কাবুল সরাসরি এমন অভিযোগ অস্বীকার বা স্পষ্টভাবে স্বীকার—কোনোটিই করেনি।
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান অভিযান শুরুর পর থেকে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে তালেবান ও তাদের সমর্থক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অসন্তোষ ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে টিটিপি বছরের পর বছর সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে আসছে। ২০২১ সালে মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তান ছাড়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা বদলালেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিটিপির হামলা আবারও বেড়েছে। এতে বহু সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান আফগান ভূখণ্ডে সরাসরি সামরিক অভিযান জোরদার করেছে। ইসলামাবাদের দাবি, এসব অভিযানে বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র সদস্য নিহত হয়েছে। অন্যদিকে তালেবানও পাল্টা হামলায় পাকিস্তানি সেনাদের হতাহতের দাবি করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—দীর্ঘদিনের এই সংকট কি কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে সমাধান সম্ভব?


সংলাপের পক্ষে ইমরান খানের অবস্থান
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী Imran Khan বরাবরই সামরিক সমাধানের পরিবর্তে রাজনৈতিক আলোচনার পক্ষে মত দিয়েছেন। তার মতে, টিটিপির বিরুদ্ধে অভিযান চালালেই তারা সীমান্ত পেরিয়ে আফগানিস্তানে আশ্রয় নেয়; তাই কাবুলের সহযোগিতা ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি টিটিপির কিছু অংশের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছিলেন এবং আফগান তালেবানের মধ্যস্থতার কথাও উল্লেখ করেছিলেন।
তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই আলোচনার প্রক্রিয়া থেমে যায়। এরপর থেকে সীমান্ত পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। খানের সমালোচকরা তাকে তালেবানপন্থী হিসেবে আখ্যা দিলেও তিনি দাবি করেছিলেন, রাজনৈতিক সংলাপই সহিংসতা কমানোর কার্যকর পথ।


‘তালেবান খান’ বিতর্ক
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম Al Jazeera এক প্রতিবেদনে ইমরান খানকে ‘তালেবান খান’ বলে উল্লেখ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি তালেবান ইস্যুতে আগের সরকারগুলোর তুলনায় ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। যেখানে পূর্ববর্তী সরকারগুলো কেবল শক্তি প্রয়োগের নীতি অনুসরণ করেছিল, সেখানে খান সংলাপ ও পুনর্মিলনের পথ খুঁজেছিলেন।
তার যুক্তি ছিল—দীর্ঘ দুই দশকের সামরিক কৌশল কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। বরং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও আলোচনার মাধ্যমে সহিংসতা কমানো সম্ভব।
সামনে কোন পথ?
বর্তমান প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ছে। সীমান্তে সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি হামলা এবং হতাহতের দাবিতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কেবল সামরিক পদক্ষেপে স্বল্পমেয়াদি সাফল্য মিললেও দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে হলে কূটনৈতিক উদ্যোগ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক সংলাপ জরুরি।
দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে যাবে—তা নির্ভর করছে তারা সংঘাতের পথেই অটল থাকবে, নাকি আলোচনার টেবিলে বসে সমাধানের নতুন অধ্যায় শুরু করবে তার ওপর।











