কুমিল্লাশনিবার, ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ইরানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়ার অপপ্রচার

প্রতিবেদক
Cumilla Press
জানুয়ারি ১৪, ২০২৬ ৩:২১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ইরানে ইসলামি শাসনব্যবস্থার পতনের লক্ষ্যে পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, অপপ্রচার এবং মনগড়া তথ্য ছড়ানোর কৌশল নতুন কিছু নয়। ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে একটি সুসংগঠিত তথ্যযুদ্ধ চালিয়ে আসছে। তবে এই ইরানবিরোধী মিডিয়া অভিযানে কোনো সমন্বিত মানদণ্ড বা নির্ভরযোগ্যতা নেই; বরং প্রতিটি গণমাধ্যম ও সংস্থা নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন তথ্য হাজির করছে।

সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ঘিরে পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা নিয়ে চরম অসঙ্গতি স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে।

ব্রিটেনভিত্তিক ইরান ইন্টারন্যাশনাল যেখানে ১২ হাজার মৃত্যুর দাবি করছে, সেখানে একই দেশের বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে ২ হাজার। গত মঙ্গলবার রয়টার্স এক ইরানি সরকারি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেছে, যা বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রচারিত হয়েছে। অথচ একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, “রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে ওই ইরানি কর্মকর্তা দাবি করেন, বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা কর্মী—উভয় পক্ষের মৃত্যুর পেছনে ‘সন্ত্রাসীরা’ দায়ী। তবে নিহতদের মধ্যে কতজন সাধারণ মানুষ আর কতজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, সে বিষয়ে ওই কর্মকর্তা কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেননি।

ইরান সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মোট নিহতের সংখ্যা প্রকাশ না করলেও পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো অ্যাক্টিভিস্ট ও তথাকথিত অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাতে একের পর এক ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা প্রচার করছে। ব্রিটেনভিত্তিক সিবিএস নিউজ ১২ হাজার থেকে ২০ হাজার মৃত্যুর দাবি করেছে। ফ্রান্স২৪ মানবাধিকার সংগঠন HRANA-র বরাতে জানিয়েছে ২ হাজারের বেশি, এবিসি নিউজ বলছে ২ হাজার ৫০০-এর বেশি, সিএনএন ৫০০-এর বেশি এবং জার্মানির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ডয়চে ভেলে ৫৪০ জনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক HRANA আবার নিহতের সংখ্যা ২,০০৩ থেকে ২,৫৭১ বলে দাবি করছে।

এমনকি জাতিসংঘও অ্যাক্টিভিস্টদের দাবির আলোকে ‘শত শত মৃত্যুর’ কথা বলেছে।

অন্যদিকে ইরানের সরকারি সূত্র জানিয়েছে, দাঙ্গাবাজদের হামলায় শতাধিক নিরাপত্তা সদস্য শাহাদাত বরণ করেছেন। পাশাপাশি শিশু ও নারীসহ বহু বেসামরিক নাগরিকও প্রাণ হারিয়েছেন। তবে সামগ্রিক হতাহতের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান সরকার এখনো প্রকাশ করেনি।

এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট, পশ্চিমা গণমাধ্যম নিজেদের সংবাদ তৈরির প্রক্রিয়াতেই বড় ধরনের স্ববিরোধিতার মুখোশ খুলে দিচ্ছে।

একদিকে তারা দাবি করছে, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আড়াল করতে ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে; অন্যদিকে একই সময়ে তারা নির্দিষ্টভাবে ‘২ হাজার’, ‘১২ হাজার’ এমনকি ‘২০ হাজার’ মৃত্যুর দাবি করছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে এসব সংখ্যার তথ্যসূত্র কী? নাকি তারা মাঠে নেমে একে একে লাশ গণনা করেছে?

বাস্তবতা হলো, এসব সংখ্যা কাল্পনিক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের জন্য ব্যবহৃত একটি তথ্য-অস্ত্র। এই অপপ্রচার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ভবিষ্যতে হয়তো ‘কাল্পনিক নিহতের সংখ্যা’ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলেও তারা দাবি করতে পারে।

আরও বড় প্রশ্ন হলো, যেসব দেশ একতরফা ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইরানের সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রাকে চরম দুর্বিষহ করে তুলেছে, তারাই আবার দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে হওয়া বিক্ষোভকে সমর্থন ও উসকে দিচ্ছে। এরপর সেই সহিংস দাঙ্গার মৃত্যুসংখ্যা নিয়ে তারা সাংবাদিকতার ছদ্মাবরণে একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যযুদ্ধ চালাচ্ছে।

এই অপতৎপরতার লক্ষ্য পরিষ্কার—ইরানের স্থিতিশীলতাকে সরকারি ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করা এবং সম্ভাব্য মার্কিন–ইসরায়েলি আগ্রাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। এটি কোনো মানবাধিকার উদ্বেগ নয়; বরং একটি সুপরিকল্পিত ভূরাজনৈতিক কৌশল।

এই দ্বিচারিতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করলে। গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ২০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় তারা কার্যত নীরব থেকেছে—কোনো কার্যকর নিষেধাজ্ঞা নেই, নেই জোরালো নৈতিক অবস্থান। এমনকি নারী ও শিশুদের প্রকৃত মৃত্যুসংখ্যা নিরূপণে কোনো আন্তরিক উদ্যোগও দেখা যায়নি। অথচ ইরানে কয়েকজন মোসাদ-সমর্থিত দাঙ্গাকারীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তারা দ্রুত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ইরানি কূটনীতিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। এই আচরণ নিঃসন্দেহে চরম ভণ্ডামি, নৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং রাজনৈতিক সুবিধাবাদেরই বহিঃপ্রকাশ।

ইরানের জনগণ অতীতে বারবার প্রমাণ করেছেন, তারা বহিরাগত হস্তক্ষেপ ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে সক্ষম। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশজুড়ে কোটি কোটি মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত সমাবেশ তারই স্পষ্ট প্রমাণ। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সময়ের দাবি হলো, তথ্যসন্ত্রাস ও রাজনৈতিক আগ্রাসনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা দ্বিচারিতার মুখোশ উন্মোচন করা এবং ইরানসহ সব স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, স্থিতিশীলতা ও আত্মনির্ধারণের অধিকারকে ন্যায্যভাবে সম্মান জানানো।