কুমিল্লাবৃহস্পতিবার, ১৯শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ইউরোপ ট্রাম্পকে জানিয়ে দিয়েছে, ‘ইরান যুদ্ধ আমাদের নয়’

প্রতিবেদক
Cumilla Press
মার্চ ১৯, ২০২৬ ৩:০৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

নিজেকে প্রায়ই ট্রান্সআটলান্টিকপন্থি বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস। ট্রান্সআটলান্টিকপন্থি বলতে যিনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো-সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রতা ও সমন্বয়কে গুরুত্ব দেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে তার বক্তব্য অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট।

যখন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দেশগুলিকে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক উদ্যোগে যোগ দিতে এবং হরমুজ প্রণালী খোলার জন্য যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের আহ্বান জানালেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ঘনিষ্ঠ মিত্র তাকে প্রত্যাখ্যান করল। যার মধ্যে জার্মানি অন্যতম।

ম্যার্ৎস গত বুধবার বার্লিনে জার্মান আইনপ্রণেতাদের বলেন, তিনি মনে করেন ইরানকে প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য হুমকি হতে দেয়া যাবে না। কিন্তু পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরান যুদ্ধে যুক্ত হওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত কোনো সন্তোষজনক পরিকল্পনা নেই যে কিভাবে এই অভিযান সফল হবে। ওয়াশিংটন আমাদের সঙ্গে পরামর্শ করেনি এবং বলেনি যে, ইউরোপের সাহায্য প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিতাম না। তাই আমরা ঘোষণা করেছি, যতদিন যুদ্ধ চলবে, আমরা হরমুজ প্রণালীতে কার্গো জাহাজ সুরক্ষার মতো কাজে, যেমন সামরিকভাবে, অংশগ্রহণ করব না।’

শুধু ম্যার্ৎসই নয়, বেশিরভাগ ইউরোপীয় নেতাই সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সামরিক অভিযানে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা এমন এক অনিশ্চিত সংঘর্ষে জড়াতে চান না, যার উদ্দেশ্য পুরোপুরি বোঝা যায় না এবং যা তাদের নাগরিকদের কাছে জনপ্রিয় নয়।

এর মাধ্যমে তারা হিসাব কষছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে শুল্ক বিরোধের মতো বিভিন্ন কারণে ইতোমধ্যেই মারাত্মক চাপের মধ্যে থাকা ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে বহুবিধ ঝুঁকি রয়েছে, তার চেয়ে নিষ্ক্রিয় থাকার সুবিধাই বেশি।

ম্যার্ৎসের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস গত সোমবার (১৬ মার্চ) তার মতোই সরাসরি মন্তব্য করেছেন: ‘এটি আমাদের যুদ্ধ নয়, আমরা এটা শুরু করিনি।’ জার্মানির সঙ্গে সংহতি জানান ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল ম্যাক্রো। বলেন, ‘আমরা এই সংঘাতের পক্ষ নই।’

ইউরোপীয়রা দীর্ঘদিন ধরেই শঙ্কিত যে, ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করলে তিনি ইউক্রেন বিষয়ে তাদের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ তুলে নিতে পারেন অথবা মস্কোর অনুকূলে কোনো চুক্তি মেনে নিতে কিয়েভকে বাধ্য করার চেষ্টা করতে পারেন।

এছাড়া এরই মধ্যে ন্যাটো জোটের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। চলতি বছরের শুরুতে ন্যাটোর সদস্য ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখলের ট্রাম্পের পরিকল্পনায় দেশগুলো বিচলিত হয়ে পড়ে।

ইরান যুদ্ধে যোগ না দেয়ায় ন্যাটো মিত্রদের ওপর বেজায় ক্ষেপেছেন ট্রাম্প। শাস্তি দেয়ার কোনো পরিকল্পনার ইঙ্গিত না দিলেও তিনি বলেছেন যে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে যোগ না দিয়ে তারা একটি ‘অত্যন্ত বোকামিপূর্ণ ভুল’ করেছে।

ট্রাম্প বিশেষ করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেছেন, যাকে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের নেতা উইনস্টন চার্চিলের মতো ‘নন’ বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু স্টারমার এবং অন্য নেতাদের পক্ষে ইউরোপীয় জনমত রয়েছে। ইউগভ-এর একটি জরিপে দেখা গেছে, ৪৯ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক ইরান আগ্রাসনের বিরোধী।

এর ফলে নাইজেল ফারাজের জনতুষ্টিবাদী রিফর্ম ইউকে পার্টি এবং বিরোধী কনজারভেটিভরা মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার প্রতি তাদের প্রাথমিক সমর্থন সংযত করতে এবং এমনকি কিছুটা সমর্থন জানাতেও বাধ্য হয়েছে। 

কনজারভেটিভ নেতা কেমি ব্যাডেনক বলেন, ‘আমি কিয়ার স্টারমারের সবচেয়ে বড় সমালোচক, কিন্তু হোয়াইট হাউস থেকে আসা এই কথার লড়াই ছেলেমানুষি।’ রিফর্ম ইউকে-র রবার্ট জেনরিক বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে বিদেশি নেতাদের দ্বারা তিরস্কৃত হতে দেখাটা আমার ভালো লাগে না।’

স্পেনে প্রধানমন্ত্রী সানচেজ ইরানের ওপর হামলাকে ‘বেপরোয়া ও অবৈধ’ বলে দ্রুত নিন্দা জানান। এমনকি যুদ্ধের জন্য যৌথভাবে পরিচালিত ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে না দিলে স্পেনের সাথে বাণিজ্য বন্ধ করে দেয়ার ট্রাম্পের যে  হুমকি তাও উড়িয়ে দেন তিনি।

ইরানে ইসরাইল ও আমেরিকার আগ্রাসনের পরই মার্চ মাসের শুরুর দিকেই স্পেনের উপ-প্রধানমন্ত্রী মারিয়া হোসে মন্তেরো বলেন, ‘আমরা অবশ্যই কারোর অনুচর হতে যাচ্ছি না, আমরা কোনো হুমকি সহ্য করব না এবং আমরা আমাদের মূল্যবোধ রক্ষা করব।’

সানচেজ সরকারের এই অবস্থান স্প্যানিশদের মধ্যেও ব্যাপকভাবে সমর্থন পেয়েছে। স্প্যানিশ সংস্থা ৪০ডিবি-র একটি জরিপ মতে, স্পেনের ৬৮ শতাংশ মানুষই ইরান যুদ্ধের বিরোধী।

জার্মানরাও এই যুদ্ধ চান না। এআরডি ডয়েচলান্ডট্রেন্ড-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৫৮ শতাংশ জার্মান এই যুদ্ধের বিরোধী এবং মাত্র ২৫ শতাংশ যুদ্ধের পক্ষে। এমনকি উগ্র-ডানপন্থি দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি থেকেও সমালোচনা এসেছে, যে দলটি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

দলটির সহ-নেতা টিনো ক্রুপাল্লা বলেছেন, ‘ডনাল্ড ট্রাম্প একজন শান্তিকামী প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদ শুরু করেছিলেন। কিন্তু তিনি একজন যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষ করবেন।’  

ইউরোপীয় সরকারগুলো বলছে, তারা এমন কোনো যুদ্ধে জড়াতে চায় না, যে বিষয়ে তাদের কোনো মতামত দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি এবং যার পরিণাম তারা দেখতে পাচ্ছে না।

একজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা, যিনি সংবেদনশীলতার কারণে নিজের পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন, তিনি বলেছেন যে আমেরিকার যুদ্ধের উদ্দেশ্য সুনির্দিষ্ট বা স্পষ্ট নয় এবং সম্ভবত তা ইসরাইলের যুদ্ধের উদ্দেশ্য থেকে ভিন্ন, বিশেষ করে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে।

সম্পর্কের টানাপোড়েনের আরেকটি লক্ষণ হিসেবে জার্মান চ্যান্সেলর ম্যার্ৎস এবং অন্যরা বিশ্বব্যাপী তেলের আকাশছোঁয়া দাম কমানোর চেষ্টায় রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার জন্য ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলেছে।

ইউরোপীয় শক্তিগুলো ইরানের যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তবে তা তাদের নিজস্ব শর্তে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার বলেছেন, ব্রিটেন হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার একটি পরিকল্পনা নিয়ে মিত্রদের সঙ্গে কাজ করছে, যে পথ দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল পরিবহন করা হয়।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বলেছেন, ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক অভিযানে যোগ দিচ্ছে না। নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে প্রণালীটি সুরক্ষিত করার জন্য ফ্রান্স একটি জোট গঠনের চেষ্টা করবে – এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা থাকবে না।

প্যারিস গত সপ্তাহ ধরে ইউরোপীয়, এশীয় (ভারতসহ) এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সাথে এমন একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছে, যার আওতায় যুদ্ধজাহাজগুলো ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজকে এসকর্ট করবে তথা পাহারা দিয়ে নিয়ে যাবে।

ম্যাক্রোঁ বলেন, এই ধরনের পরিকল্পনার মধ্যে সামুদ্রিক শিল্প, বীমাকারী এবং অন্যান্যদের সাথে রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত আলোচনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে: ‘এই কাজের জন্য ইরানের সাথে আলোচনা এবং উত্তেজনা প্রশমনের প্রয়োজন হবে।’

পরিশেষে ইউরোপীয় নেতারা সর্বোপরি ঐক্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন এবং ট্রাম্পের খামখেয়ালী নেতৃত্ব বলে যা তারা মনে করেন, তা সামলাতে শিখেছেন।

ইইউ-এর পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কায়া কালাস চলতি সপ্তাহে রয়টার্সকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ন্যাটো সামরিক জোট ‘এখন আরও শান্ত, কারণ আমরা… সব সময় অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটার প্রত্যাশা করি এবং সেটিকে সেভাবেই গ্রহণ করি, কিছুটা সতর্ক থাকি এবং শান্ত থেকে মনোযোগী থাকি।’

.