আকাশ আল মামুন, কুবি:
আহমদ ছফা বাংলাদেশের আধুনিক সাহিত্য ও চিন্তার জগতে এক অনন্য নাম। তাঁর লেখনী যেমন তীক্ষ্ণ, তেমনি গভীর ভাবনার প্রতিফলনও ঘটে সেখানে। ‘ওঙ্কার’ তাঁর বহুল আলোচিত ও বহুমাত্রিক একটি রচনা, যা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে। উপন্যাসটি আত্মকথনধর্মী হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সমাজের রাজনৈতিক বাস্তবতা, নৈতিক অবক্ষয় আর এক প্রজন্মের মানসিক দোদুল্যমানতার দলিল।
উপন্যাসটি উত্তম পুরুষের বয়ানে রচিত হয়। নোবেলর তরুণ হিরোর জন্ম, বেড়ে উঠা এবং লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয় এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সমাজে ছিলো তাদের তালুকদার বংশীয় মর্যাদা এবং সেই বংশগৌরবে গদগদ হয়ে আত্মগরিমায় আক্রান্ত হয় তার বাবা। উত্তরাধিকার সূত্রে অর্জন করা ব্যাবাক জমি-জিরাতের অহমিকায় তরুণের বাবা গ্রামের মানুষের সাথে ছোট থেকে ছোট বিষয় নিয়েও ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন। সারাক্ষণ ফন্দিফিকির করতে থাকেন কীভাবে সেই মানুষটিকে (যার উপর তিনি ক্ষুব্দ) মামলায় অভিযুক্ত করে ফায়দা হাসিল করা যায়। উনার এই বদমতলবে বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে ঘি ঢালতো প্রতিবেশী আবু নসর মোক্তার সাহেব।
তরুণ ছেলেটি এক আলাপে তার বাবাকে নিয়ে বলতে গিয়ে বলেন ‘তিনি ছিলেন পবিত্র পশু’। খোদার দেয়া শরীয়তের প্রতিটি বিধান তারা বাবা পালন করেন। মসজিদে নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন এবং বড়ই পরহেজগার মানুষ হিসেবে সমাজে বিবেচিত হোন। সারকাস্টিক স্টোরিটা হলো মিথ্যা মামলায় জিতার জন্য শুনানির দিন উনার বাড়িতে হতো কোরান খতম, রোজা রাখতেন উনার মোমের মতো মোলায়েম মনের স্ত্রী। তবে পোলাও-কোরমা খেয়ে গিয়েও সাক্ষীগণ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতো।
ছফা স্যারের এই উপন্যাসে একটি প্যারাডক্সিকাল ঘটনা আছে সেটা হলো তরুণের পিতার জীবনের শেষ ভাগে তার অতি বিশ্বস্ত বন্ধু আবু নসর মোক্তার সাহেবের কাছে মামলায় হেরে ভিটে-বাড়িসহ উঠান, পুকুর সবই খোয়াতে হয়। তিনি তখন শয্যাশায়ী। গল্পের হিরো তখন বিএ পাশ করে গ্রামে ফিরে এসেছে। পরিবারের এই দুর্দিনের কথা শুনে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে ভাবতে থাকে বাবা-মা আর ছোট বোনকে নিয়ে সে এখন কোথায় যাবে!
ছফা স্যারের আলাপে আবহমান বাংলার আপামর জনতার জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। এই পরিবারের পতনের গল্পটা আসলে বাংলাদেশের সামন্ততান্ত্রিক সমাজের আত্মবিনাশের গল্প। মিথ্যা মামলায় জেতার জন্য কোরান খতম আর রোজা রাখলেও ন্যায়পরায়ণতার জায়গায় দাঁড়িয়ে তারা চিরকাল হেরে যায়। আর এই হেরে যাওয়ার মাঝেই জন্ম নেয় পরবর্তী প্রজন্মের এক চিরায়ত বাস্তবতা যেখানে ন্যায়, প্রেম, এবং টিকে থাকার লড়াই একে অন্যের সঙ্গে মিশে যায়।
উপন্যাসের টুইস্ট শুরু হয় এখান থেকেই। আবু নসর সাহেব ওদের বাড়িতে এসে তার বাবার খোঁজ খবর নিয়ে একটি প্রস্তাব দিয়ে যায়। প্রস্তাবের জবাবে; যার কাছে মামলায় হেরে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে সেই বিশ্বাসঘাতক বন্ধুর বোবা মেয়ের সঙ্গে নিজের ছেলেকে (গল্পের হিরো) বিয়েতে রাজি করিয়ে দেন। কারণ, প্রভাবশালী আবু নসর তখন তাদের দারিদ্র্য-দুর্দশায় জর্জরিত জীবনে চলার পথে আলোকবর্তিকা হয়ে আবির্ভূত হন। এটি এক ভয়াবহ বাস্তবতা যে মানুষ নিজের পতনের জন্য দায়ী, তারই ঘরে আশ্রয় নিবে পরবর্তী প্রজন্ম। আর এই বিয়েটাই হয়ে ওঠে ইতিহাসের প্রতীক, একজন মানুষ যখন লড়াইয়ের সাহস হারায়, তখন সে নিজেরই শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করে।
তরুণ ছেলেটি বিয়ের পর শহরে আসে। শশুরের প্রতাপে চাকরি পায়, স্বচ্ছলতার সহিত বাঁচতে শেখে। কিন্তু বউ বোবা। জীবনের কোলাহলের মাঝে তার এই স্তব্ধতা যেনো বাংলাদেশের নিস্তব্ধ জনগোষ্ঠীর প্রতিচ্ছবি। চারদিকে অন্যরা যখন বউয়ের কণ্ঠে গান শুনে, গল্প বলে, ভালোবাসার ভাষা খুঁজে পায়, তখন সে শুধু বোবা নিরবতায় ডুবে থাকে। দুনিয়াতে যাহাকিছু চিরন্তন তার মধ্যে গলার স্বর অন্যতম। সে বেঁচে থাকে, কিন্তু বেঁচে থাকা মানেই বোধহয় জীবিত থাকা নয়।
এই নিরাসক্ত জীবনেই ঊনসত্তরের এক দিনে দেশের রাজপথে আগুন জ্বলে ওঠে। দেশে তখন ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের মার্শাল ল’, নাগরিক স্বাধীনতা অবরোধ এবং নির্যাতনের শাসন ব্যবস্থা বহাল ছিলো। এই টাইরান্নি সরকারের বিরুদ্ধে সেইসময়ে রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হোন আসাদ। তার রক্তে ভেজা শার্ট হাতে নিয়ে ঢাকার রাজপথে মিছিল হচ্ছে। আন্দোলনকারীরা তখন আর অহিংস পদযাত্রায় নিজেদের আটকে রাখতে পারছে না। তাদের ভিতরে থাকা সুপ্ত আগুনের লাভাগুলো এখন স্ফুরিত হচ্ছে। সেই সময়ের ঢাকায় মানুষের ভেতরের ভয় পুড়ে ছাই হয়ে যায়, জেগে ওঠে প্রতিরোধ।
এই জায়গায় ছফা স্যারের উপন্যাস যেনো ইতিহাসের সাথে একাত্ম হয়ে যায়। তরুণের বোবা স্ত্রী জানালায় দাঁড়িয়ে মিছিল দেখে। মিছিল যতই সামনে এগুতে থাকে তার বউয়ের শরীরে ততই অন্যরকম এক ঢেউ খেলে যায়। তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তখন অদ্ভুত এক ছন্দে দোলতে থাকে। যখন হৃদয় থেকে কোনো কিছু ধারণ করা হয় তা গোটা শরীরে ঝলমলিয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। গলার রগ ফুলিয়ে উচ্চারণ করতে চায় ‘বাংলাদেশ’। মুখ দিয়ে বেরোয় ‘বা… বা…’—আর শেষে যখন সত্যিকার শব্দ ‘বাঙলা’ বের হয়, কণ্ঠনালি দিয়ে কৃষ্ণচূড়ার মতো টকটকে লাল রক্ত বের হতে থাকে; রক্তের স্রোতে ভেসে যায় মেঝে।
এই উপন্যাসটিতে ঊনসত্তরে ঘটে যাওয়া ফিল্ড মার্শাল আইয়ুবের প্রেতাত্মাকে ধূলিসাৎ করে দেয়ার জন্য সাগরের তরঙ্গমালার মতো আছড়ে পড়ে জনতার সমুদ্র। যাকে বলা হয় ‘ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান’।
বোবা মেয়ের এই রক্ত ছিলো একটি জাতির মুক্তির প্রতীক। ছফা স্যার উপন্যাসের অন্তিম অংশে তরুণের ভাষায় লেখেন – “কার রক্ত বেশি লাল? শহীদ আসাদের, নাকি আমার বোবা বউয়ের?”
এই প্রশ্নটাই সময় পেরিয়ে আজ এসে ঠেকেছে ২০২৪ সালের ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ এর প্রেক্ষাপটে। স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার মধ্যমণি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দুঃশাসন ও অত্যাচারের ভয়াবহতা এবং অন্যায়ভাবে দখল করা শাসনব্যবস্থা থেকে জাতিকে বাঁচাতে শিক্ষার্থীরা গড়ে তুলেছিলো এক আন্দোলন, যেখানে নদীর স্রোতের মতো রাজপথে নেমে এসেছিলো ছাত্র-জনতা।
‘মুনসুন রেভ্যুলেশনের’ পূর্বে এই জাতি ছিলো বোবা, বছরের পর বছর ধরে ভয় আর জাহিলিয়্যাতের নির্যাতনের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হয়েছিলো। যদিও অনেকেই তখন অন্যায়ভাবে প্রতিষ্ঠিত সরকার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলতো! কিন্তু এটা ছিলো খুবই কম। ‘বর্ষাদ্রোহের’ এক রোদেলা দিনে যখন পুলিশের গুলিতে ঝাঁঝরা হওয়া শহীদ আবু সাঈদের রক্তাক্ত দেহের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলো তখন মুহূর্তেই সেই বোবা জাতি উচ্চারণ করলো নিজেদের নাম। ‘বাঙলা’ নয়, এবারের উচ্চারণ ‘বাংলাদেশ’।
সোশ্যাল মিডিয়ার বরাতে সাধারণ জনগণের হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ হয়েছিলো; সেই রক্তের দৃশ্যই যেনো ‘ওঙ্কার’-এর বোবা বউয়ের কণ্ঠ ফেটে রক্ত ঝরার আধুনিক রূপ। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে শুধু সময়ের পোশাকটা বদলে গেছে। তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বোবা নারী বলেছিলো ‘বাঙলা’, আজ মানুষ বলছে ‘বাঁচতে চাই’। তখন বুলেট ছিলো পুলিশের, আজও তাই। ইতিহাসের এই নির্মম অধ্যায়গুলোতে পুলিশ সবসময়ই কি খলনায়কের ভূমিকা পালন করে!
আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’ উপন্যাসটি হলো এক আত্মস্বরের পুনর্জন্মের কাহিনি। যেখানে প্রতিটি নীরবতা শেষমেশ শব্দে ফেটে পড়ে, প্রতিটি ভয়ের ভেতর লুকিয়ে থাকে বিদ্রোহের অঙ্কুর। যখন মানুষ নীরবতার অভিশাপ কাটিয়ে শব্দ উচ্চারণ করে তখনই বিপ্লব ঘটে। কবি হাসান রুবায়েত ভাই বলেছনে, ‘আমরা কথা বলি, কারণ নিরবতা হলো ফ্যাসিস্টের ভাষা।’
২০২৪-এর ‘শ্রাবণ বিপ্লবে’ শহীদ আবু সাঈদের রক্তে আবারও জেগে উঠেছে সেই একই প্রশ্ন, কার রক্ত বেশি লাল? আসাদের, বোবা বউয়ের, নাকি এই সময়ের আবু সাঈদের?
সম্ভবত সব রক্তের রংই এক–লাল, কিন্তু তার ভেতরে জেগে থাকে এক অনন্ত জাগরণের আহ্বান।
ছফা স্যারের ভাষা কাব্যময় হলেও এতে তীব্র ব্যঙ্গ, বাস্তববোধ ও দার্শনিক গভীরতা রয়েছে। তাঁর বাক্য গঠন সরল হলেও এর ভেতরকার অর্থ বহুমাত্রিক। চরিত্রদের কথোপকথন, আত্মসমালোচনা ও ঘটনাবর্ণনা পাঠককে কেবল কাহিনি নয়, চিন্তার ভেতরও ডুবিয়ে দেয়।
‘ওঙ্কার’ উপন্যাসটি হলো একটি যুগের রাজনৈতিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের দলিল। আহমদ ছফা একদিকে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও দুঃখ-বেদনা তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে গোটা জাতির মানসিক অবস্থা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়কেও চিত্রিত করেছেন।












